H.S GEOGRAPHYSEMESTER-4

পাত সংস্থান তত্ত্ব: কারণ, সীমানা ও ভূমিরূপ – সম্পূর্ণ প্রশ্ন উত্তর (HS Geography Semester 4)

পৃথিবীর মানচিত্র কেন স্থির নয়? কেন হিমালয় পর্বত আজও উচ্চতায় বাড়ছে কিংবা জাপানে কেন এত ঘনঘন ভূমিকম্প হয়? আধুনিক ভূ-গাঠনিক বিদ্যার এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ‘পাত সংস্থান তত্ত্ব’ (Plate Tectonic Theory)-এর মধ্যে।

Webbhugol.com-এর আজকের এই পোস্টে আমরা উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল (সেমিস্টার ৪)-এর সিলেবাস অনুযায়ী পাত সঞ্চলনের কারণ, বিভিন্ন পাত সীমান্তে গঠিত ভূমিরূপ, বেনিয়ফ জোন এবং এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি ছোট ও বড় প্রশ্ন এখানে এমনভাবে পয়েন্ট করে সহজ ভাষায় সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তোমরা একবার পড়লেই বিষয়টি আয়ত্ত করতে পারো এবং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাও।”

Table of Contents

উত্তর: ভূত্বকীয় পাত বা প্লেটগুলি স্থির নয়, এগুলি সর্বদা সচল বা গতিশীল। তবে এই গতিশীলতা অত্যন্ত ধীর প্রকৃতির। ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, পাতের এই চলনের পেছনে ভূ-অভ্যন্তরের একাধিক শক্তি বা বল ক্রিয়াশীল। নিচে পাত সঞ্চলনের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করা হলো:
১. পরিচলন স্রোত (Convection Current):
পাত সঞ্চলনের মূল চালিকাশক্তি হল পরিচলন স্রোত। ১৯৬০-এর দশকে প্রখ্যাত ভূ-বিজ্ঞানী আর্থার হোমস (Arthur Holmes) সর্বপ্রথম এই মতবাদটি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে র‍্যালে, টুর কোট্রে এবং টোজার এই মতবাদকে সমর্থন ও পরিমার্জন করেন।
প্রক্রিয়া: ভূ-অভ্যন্তরে গুরুমন্ডলের অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে তেজস্ক্রিয় তাপের প্রভাবে সান্দ্র ম্যাগমার মধ্যে তাপীয় পরিচলন স্রোতের সৃষ্টি হয়। এই স্রোত যখন ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দুই প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন উপরের পাতগুলি একে অপরের থেকে দূরে সরে যায় (প্রতিসারী চলন)। আবার স্রোত যখন শীতল হয়ে নিম্নমুখী হয়, তখন পাতগুলি একে অপরের দিকে এগিয়ে আসে (অভিসারী চলন)।

পাত সঞ্চালনের প্রধান কারণ ভূ-অভ্যন্তরের পরিচলন স্রোত (Convection Current) এর ডায়াগ্রাম।
পাত সঞ্চালনের প্রধান কারণ ভূ-অভ্যন্তরের পরিচলন স্রোত (Convection Current) এর ডায়াগ্রাম।


২. অভিকর্ষজ বল (Gravitational Force):
পাত সঞ্চলনে অভিকর্ষজ বল বা ‘Ridge Push‘ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা অঞ্চলটি সমুদ্রবক্ষ থেকে অনেকটা উঁচুতে অবস্থান করে এবং সামুদ্রিক খাত বা পাতের প্রান্তভাগ নিচুতে থাকে। এই উচ্চতার পার্থক্যের কারণে, অভিকর্ষজ টানে পাতগুলি উঁচু শৈলশিরা থেকে ঢাল বেয়ে নিচু অংশের দিকে নেমে যায় বা সঞ্চলিত হয়।
৩. পাতের নিমজ্জন টান বা স্ল্যাব পুল (Slab Pull):
অভিসারী পাত সীমান্তে যখন একটি ভারী মহাসাগরীয় পাত হালকা পাতের নিচে বা সমুদ্রখাতে প্রবেশ করে, তখন নিমজ্জিত অংশের ওজনের টানে পাতের বাকি অংশটিও সামনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে, একে ‘স্ল্যাব পুল’ বা পাতের নিমজ্জন টান বলা হয়। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পরিচলন স্রোতের চেয়ে এই ‘টান’ পাতের গতি বাড়াতে বেশি ভূমিকা গ্রহণ করে।
৪. ম্যাগমার অনুপ্রবেশ ও চাপ (Magma Intrusion):
মধ্য সামুদ্রিক শৈলশিরা বা প্রতিসারী পাত সীমান্তে ফাটল দিয়ে যখন ভূ-অভ্যন্তর থেকে উত্তপ্ত ম্যাগমা প্রবল চাপে বেরিয়ে আসে, তখন তা দুই পাশের পাতের গায়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। ম্যাগমার এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ এবং অনুপ্রবেশের ফলে পাত দুটি দুই পাশে সরে যেতে বাধ্য হয় অর্থাৎ পাতের চলন ঘটে।
৫. তপ্ত বিন্দু বা হটস্পট (Hot Spot):
ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, গুরুমন্ডলের গভীরে প্রায় ২১টি এমন স্থান রয়েছে যেখানে তাপমাত্রা ও ম্যাগমার ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। এদের ‘তপ্ত বিন্দু’ বা Hot Spot বলা হয়। এই হটস্পট থেকে ম্যাগমা বা প্লিউম (Plume) ফোয়ারার মতো উপরে উঠে এসে ভূত্বকের নিচে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি অনুভূমিক বলের সৃষ্টি করে, যা পাতগুলিকে গতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, পাত সঞ্চলন কোনো একটি একক শক্তির ফল নয়। পরিচলন স্রোত, অভিকর্ষজ বল, স্ল্যাব পুল এবং ম্যাগমার যান্ত্রিক চাপের সম্মিলিত ক্রিয়ার ফলেই ভূত্বকীয় পাতগুলি ধীর গতিতে স্থান পরিবর্তন করে।

উত্তর: ভূত্বকীয় পাতগুলি যে স্থির নয় বরং সর্বদা সচল, তার সপক্ষে একাধিক ভূতাত্ত্বিক ও আধুনিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রধান প্রমাণগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আধুনিক GPS প্রযুক্তি:
বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম উপগ্রহ ভিত্তিক GPS (Global Positioning System) প্রযুক্তির সাহায্যে পাতের অবস্থান ও গতিবেগ নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, পাতগুলি বছরে গড়ে ২ থেকে ১০ সেমি করে সরে যাচ্ছে। এটি পাত সঞ্চলনের সবথেকে আধুনিক ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
২. ভূমিকম্প ও বেনিয়ফ জোন:
সমুদ্র তলদেশে যেখানে দুটি পাত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, সেখানে একটি পাত অন্যটির নিচে ঢালু হয়ে প্রবেশ করে। এই ঢালু সংযোগস্থলের (Beni-Off-Zone) গভীরতা যত বাড়ে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রগুলিও তত গভীরে দেখা যায়। পাতের ঘর্ষণজনিত এই ভূমিকম্প প্রমাণ করে যে পাতগুলি গতিশীল এবং একটি অন্যটির নিচে নিমজ্জিত হচ্ছে।
৩. নবীন শিলা ও ভূ-তাপ:
সমুদ্রবক্ষের শিলাগুলি মহাদেশীয় শিলার তুলনায় অনেক নবীন এবং সেখানে পলিস্তরের গভীরতাও খুব কম। এর থেকে বোঝা যায়, সমুদ্রবক্ষ স্থির নয়। এছাড়া, সমুদ্রখাত অঞ্চলে পাতের নিমজ্জনের কারণে শীতল শিলা নিচে চলে যায়, ফলে সেখানে ভূ-তাপ নির্গমন (Heat Flow) অনেক কম হয়, যা পাতের চলনকে নির্দেশ করে।
৪. চ্যুতি বা ফাটল রেখা:
ক্যালিফোর্নিয়ার সান-আন্দ্রিয়াস চ্যুতি (San Andreas Fault) একটি ট্রান্সফর্ম বা নিরপেক্ষ চ্যুতি। ১০০০ কিমি দীর্ঘ এই চ্যুতিরেখা বরাবর শিলাস্তরের প্রায় ৫৬০ কিমি অনুভূমিক সরণ ঘটেছে, যা একমাত্র পাতের চলনের ফলেই সম্ভব।

আধুনিক ভূগাঠনিক বিদ্যায় ‘পাতসংস্থান তত্ত্ব’ বা ‘প্লেট টেকটোনিক থিওরি’ সর্বজনগ্রাহ্য এবং বৈজ্ঞানিক মতবাদ হিসেবে পরিচিত। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত এবং পর্বত সৃষ্টির ব্যাখ্যা খুব সুন্দরভাবে পাওয়া যায়। তবুও, ভূতাত্ত্বিকরা এই তত্ত্বের বেশ কিছু ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছেন। নিচে সেগুলি আলোচনা করা হলো:

১. পাতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ (Disagreement on Plate Numbers): পৃথিবীতে ঠিক কতগুলি পাত বা প্লেট রয়েছে, তা নিয়ে ভূবিজ্ঞানীদের মধ্যে ঐকমত্য নেই। বিভিন্ন বিজ্ঞানী পাতের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন বলেছেন। যেমন—

  • বিজ্ঞানী মরগ্যান (W.J. Morgan)-এর মতে পৃথিবীতে মোট পাতের সংখ্যা ২০টি।
  • বিজ্ঞানী কিং (King)-এর মতে প্রধান পাতের সংখ্যা ৬টি এবং সাথে কিছু ক্ষুদ্র পাত রয়েছে।
  • অন্যদিকে, বিজ্ঞানী পিঁচো (Le Pichon)-এর মতে পৃথিবীতে ৭টি বৃহৎ, ৮টি মাঝারি এবং ২০টি ক্ষুদ্র পাত রয়েছে। সংখ্যার এই ভিন্নতা তত্ত্বটির একটি বড় দুর্বলতা।

২. পাতের গতিবিধি সংক্রান্ত বিভ্রান্তি (Confusion regarding Movement): সব পাতের গতিবিধি বৈজ্ঞানিক সূত্র মেনে চলে না। অনেক সময় একই পাতের দুদিকে সঞ্চলন বা পাশাপাশি সঞ্চলন নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, সান-আন্দ্রিজ চ্যুতি (San Andreas Fault) বরাবর উত্তর আমেরিকান পাত এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত যথাক্রমে পশ্চিম ও পূর্ব দিকে না গিয়ে উত্তর-দক্ষিণে পাশাপাশি সঞ্চলিত হয় কেন, তার সঠিক ব্যাখ্যা এই তত্ত্বে সবসময় স্পষ্ট নয়।

৩. নিমজ্জন অঞ্চলের অস্পষ্টতা (Ambiguity of Subduction Zone): পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুসারে, যেখানে দুটি পাত মিলিত হয় সেখানে একটি পাত অন্যটির নিচে চলে গেলে ‘বেনিয়ফ জোন’ (Benioff Zone) সৃষ্টি হওয়ার কথা। প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি খুব স্পষ্ট হলেও, অন্যান্য মহাসাগরীয় সীমান্তে বা নিমজ্জন অঞ্চলে সর্বদা সুস্পষ্ট বেনিয়ফ তল বা ভূমিকম্প কেন্দ্র গড়ে উঠতে দেখা যায় না।

৪. গঠন ও বিস্তারের অসামঞ্জস্য (Discrepancy in Extension): তত্ত্ব অনুযায়ী, যেখানে নতুন ভূত্বক সৃষ্টি হয় (মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা) এবং যেখানে ভূত্বক ধ্বংস হয় (অধঃপাত অঞ্চল বা Subduction Zone), তাদের বিস্তৃতি সমান হওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সামুদ্রিক শৈলশিরার মোট দৈর্ঘ্য, পাতের বিনাশকারী বা অধঃপাত অঞ্চলের দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক বেশি। এই অসামঞ্জস্যের কোনো সঠিক ব্যাখ্যা এই তত্ত্বে নেই।

৫. ভূত্বকের প্রকৃতি (Nature of Crust): পাতসংস্থান তত্ত্বে ধরে নেওয়া হয় যে ভূত্বকীয় পাতগুলি কঠিন, অনমনীয় এবং দৃঢ়। কিন্তু বাস্তবে শিলালিমণ্ডল বা ভূত্বক অনেক ক্ষেত্রে নমনীয় এবং চাপের ফলে বিভিন্ন স্থানে বিকৃত (Deformed) হতে পারে। তত্ত্বে এই নমনীয়তার দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে।

৬. পর্বত সৃষ্টিতে ব্যাখ্যার অভাব (Unexplained Mountain Formation): পৃথিবীর সমস্ত ভঙ্গিল পর্বতের উৎপত্তি এই তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মহাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত বেশ কিছু প্রাচীন পর্বত, যেমন—ব্রাজিলের ‘সিয়েরা ডেল মার’ (Serra do Mar) কিংবা আফ্রিকার ‘ড্রাকেন্সবার্গ’ (Drakensberg) পর্বত কীভাবে সৃষ্টি হলো, তার কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ বা ব্যাখ্যা পাতসংস্থান তত্ত্বে পাওয়া যায় না।

৭. সঞ্চলনের কারণগত অস্পষ্টতা: পাতগুলি কেন সঞ্চলিত হয়, তার প্রধান কারণ হিসেবে ‘পরিচলন স্রোত’ (Convection Current)-কে ধরা হয়। কিন্তু পৃথিবীর সব পাতের সঞ্চলন শুধুমাত্র পরিচলন স্রোত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কিছু ক্ষেত্রে পাতের গতির কারণ এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

ভূ-গঠনকারী পাত বা প্লেটগুলি সর্বদা সচল। এই পাতের সীমানা বরাবরই পৃথিবীর যাবতীয় ভূ-তাত্ত্বিক ক্রিয়াকলাপ (যেমন—ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত, পর্বত গঠন) সংঘটিত হয়। নিচে পাত প্রান্ত, সীমান্ত এবং বিভিন্ন প্রকার পাত সীমান্তে গঠিত ভূমিরূপগুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. পাত প্রান্ত ও পাত সীমান্ত (Plate Margin & Plate Boundary)

অনেক সময় আমরা এই দুটি শব্দকে একই অর্থে ব্যবহার করি, কিন্তু ভূগোলের ভাষায় এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।

  • পাত প্রান্ত (Plate Margin): একটি পাতের একদম শেষ বা প্রান্তীয় অংশকে বলা হয় পাত প্রান্ত।
  • পাত সীমান্ত (Plate Boundary): যে রেখা বা অঞ্চল বরাবর দুটি পাত একে অপরের সাথে মিলিত হয়, অথবা দূরে সরে যায় কিংবা পাশাপাশি ঘর্ষণ খেয়ে চলে, সেই সংযোগস্থলকে পাত সীমান্ত বা পাত সীমানা বলা হয়।

পাতের চলনের ওপর ভিত্তি করে পাত সীমানাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়।


২. অভিসারী বা বিনাশকারী পাত সীমান্ত (Convergent Plate Boundary)

যখন দুটি পাত পরস্পরের মুখোমুখি অগ্রসর হয় এবং একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন তাকে অভিসারী পাত সীমান্ত বলে।

  • কেন বিনাশকারী? এই সীমান্তে সংঘর্ষের ফলে একটি পাত অন্যটির নিচে চলে যায় এবং গলে গিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাই একে বিনাশকারী পাত সীমানা বলা হয়।
  • ফলাফল: এই সীমান্তে প্রবল ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত ঘটে এবং ভঙ্গিল পর্বত ও বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা সৃষ্টি হয়।
চিত্র ১: ভূ-অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল পরিচলন স্রোত।

অভিসারী পাত সীমান্তে গঠিত ভূমিরূপসমূহ:

অভিসারী পাত সীমানা তিন ধরণের হতে পারে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিরূপ গড়ে ওঠে—

(ক) মহাদেশীয় ও মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষ: দুটি মহাদেশীয় পাত পরস্পরের দিকে এগিয়ে এলে তাদের মাঝখানে থাকা অগভীর সমুদ্র বা মহীখাতের (Geosyncline) পলিরাশির ওপর প্রবল চাপ পড়ে।

  • নবীন ভঙ্গিল পর্বত: মহীখাতের পলিরাশি চাপে কুঁকড়ে ও ভাঁজ খেয়ে ওপরে উঠে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি করে। উদাহরণ: হিমালয় পর্বত, আল্পস পর্বত।
  • ফ্লিশ (Flysch): পর্বত সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায়ে মহীখাতের পলি ভাঁজপ্রাপ্ত হওয়ার পর যে সামুদ্রিক ও আধা-সামুদ্রিক পলি (বেলেপাথর ও কাদা) সঞ্চিত হয়, আল্পস পার্বত্য অঞ্চলে তাকে ‘ফ্লিশ’ বলে।
  • মেলাস (Molasse): পর্বত উত্থানের পরবর্তী ধাপে, নবগঠিত পর্বতের ক্ষয়জাত পদার্থ যখন মহাদেশীয় পাদদেশে বা উপ-মহীখাতে সঞ্চিত হয়ে অগভীর জলাশয়ে বা স্থলে জমাট বাঁধে, তখন তাকে ‘মেলাস’ বলে।

(খ) মহাদেশীয় ও মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষ: একটি মহাদেশীয় ও একটি মহাসাগরীয় পাত মুখোমুখি হলে, ভারী মহাসাগরীয় পাতটি মহাদেশীয় পাতের নিচে প্রবেশ করে।

  • কর্ডিলেরা (Cordillera): দুই পাতের চাপে মধ্যবর্তী পলি ভাঁজ খেয়ে যখন শৃঙ্খল বা সারিবদ্ধভাবে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি করে, তখন তাকে কর্ডিলেরা বলে।
  • আগ্নেয় পর্বত: ভারী পাতটি ভূ-গর্ভে প্রবেশ করে তাপে গলে ম্যাগমার সৃষ্টি করে। এই ম্যাগমা ফাটল দিয়ে বেরিয়ে এসে শঙ্কু আকৃতির আগ্নেয় পর্বত তৈরি করে। উদাহরণ: মাউন্ট মৌনালোয়া।
  • সমুদ্রখাত (Ocean Trench): পাত দুটির সংযোগস্থল বরাবর গভীর সমুদ্রখাতের সৃষ্টি হয়।

(গ) মহাসাগরীয় ও মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষ: দুটি সামুদ্রিক পাত সংঘর্ষে লিপ্ত হলে অপেক্ষাকৃত ভারী ও শীতল পাতটি অন্যটির নিচে প্রবেশ করে।

  • বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা (Island Arc): নিমজ্জিত পাতের গলিত ম্যাগমা সমুদ্রতল দিয়ে বেরিয়ে এসে ক্রমশ জমতে থাকে এবং একসময় জলের ওপর জেগে ওঠে। ধনুক বা বৃত্তচাপের ন্যায় সজ্জিত এই দ্বীপগুলিকে বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা বলে। উদাহরণ: জাপান দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপাইনস, কিউরাইল ও অ্যালুশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।
  • মেলাঙ্গে (Melange): সমুদ্রখাতে পলি, আগ্নেয় ভস্ম ও শিলাচূর্ণ একসাথে মিশে যে বিশৃঙ্খল মিশ্র শিলার স্তূপ তৈরি করে, তাকে মেলাঙ্গে বলে।
  • ওফিয়োলাইট (Ophiolite): গভীর সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয় শিলাস্তর যখন ভূ-আলোড়নের ফলে ওপরে উঠে আসে এবং সবুজ বর্ণ ধারণ করে, তখন তাকে ওফিয়োলাইট স্যুট বলে।

৩. প্রতিসারী বা গঠনকারী পাত সীমান্ত (Divergent Plate Boundary)

যে সীমানায় দুটি পাত একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়, তাকে প্রতিসারী পাত সীমান্ত বলে।

  • কেন গঠনকারী? দুটি পাত সরে গেলে মাঝখানের ফাটল দিয়ে ম্যাগমা বেরিয়ে এসে শীতল হয়ে নতুন ভূত্বক গঠন করে। তাই একে গঠনকারী পাত সীমান্ত বলে।
  • ফলাফল: এখানে ভূমিকম্পের কেন্দ্র কম গভীর হয় এবং নতুন মহাসাগর বা শৈলশিরা সৃষ্টি হয়।

প্রতিসারী পাত সীমান্তে গঠিত ভূমিরূপসমূহ:

  • মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা (Mid-Oceanic Ridge): সমুদ্রের তলদেশে দুটি পাত সরে গেলে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ব্যাসল্ট জাতীয় ম্যাগমা বেরিয়ে এসে ফাটল ভরাট করে এবং দীর্ঘ পাহাড়ের মতো শৈলশিরা গঠন করে। উদাহরণ: আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যবর্তী ‘S’ আকৃতির মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা। (এর গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৪,০০০ কিমি)।
  • সাগর ও মহাসাগর সৃষ্টি: পাত দুটি ক্রমাগত দূরে সরতে থাকলে ফাটলটি প্রশস্ত হয়ে প্রথমে সাগর এবং পরে মহাসাগরের রূপ নেয়। আটলান্টিক মহাসাগর এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।
  • গ্রস্ত উপত্যকা (Rift Valley): মহাদেশীয় অংশে টান পড়লে ভূত্বক ফাটল বরাবর নিচে বসে গিয়ে গ্রস্ত উপত্যকা তৈরি করে। উদাহরণ: পূর্ব আফ্রিকার ‘গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি’ (পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রস্ত উপত্যকা)।

৪. নিরপেক্ষ বা ট্রান্সফর্ম পাত সীমান্ত (Transform Plate Boundary)

যখন দুটি পাত পরস্পরের মুখোমুখি বা বিপরীতে না গিয়ে, পাশাপাশি একে অপরকে ঘর্ষণ করে সমান্তরালে বা আড়াআড়িভাবে চলে যায়, তখন তাকে নিরপেক্ষ পাত সীমান্ত বলে।

  • বৈশিষ্ট্য: এখানে নতুন ভূত্বক সৃষ্টিও হয় না, ধ্বংসও হয় না। তবে প্রবল ঘর্ষণের ফলে তীব্র ভূমিকম্প হয়।
  • গঠিত ভূমিরূপ: এই সীমান্তে চ্যুতি (Fault) গঠিত হয়।
  • উদাহরণ: উত্তর আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের সংযোগস্থলে ক্যালিফোর্নিয়ার সান-আন্দ্রিজ চ্যুতি (San Andreas Fault), যা প্রায় ১০০০ কিমি দীর্ঘ।

উত্তর: যে পাত সীমানায় দুটি পাত পরস্পর থেকে বিপরীত দিকে সরে যায়, তাকে প্রতিসারী পাত সীমানা বলে। এই সীমান্তে টান ও ফাটলের সৃষ্টি হয় বলে নিম্নলিখিত ভূমিরূপগুলি গঠিত হয়:

১. মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা (Mid-Oceanic Ridge): সমুদ্রের তলদেশে দুটি পাত দূরে সরে গেলে যে ফাটলের সৃষ্টি হয়, সেই ফাটল পথে ভূ-অভ্যন্তরের ম্যাগমা লাভা রূপে বেরিয়ে আসে। এই লাভা ফাটলের দুপাশে জমে দীর্ঘ ও উচ্চ পর্বতশ্রেণি বা শৈলশিরা গঠন করে।

  • উদাহরণ: আমেরিকান পাত এবং ইউরেশীয় ও আফ্রিকান পাত সরে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট ‘মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা’

২. গ্রস্ত উপত্যকা (Rift Valley): মহাদেশীয় অঞ্চলে দুটি পাত বিপরীত দিকে সরে গেলে শিলাস্তরে প্রবল টানের সৃষ্টি হয়। এর ফলে সৃষ্ট ফাটল বরাবর মাঝখানের ভূখণ্ড বসে গিয়ে গভীর গ্রস্ত উপত্যকা তৈরি করে।

  • উদাহরণ: পূর্ব আফ্রিকার ‘দ্য গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি’ (The Great Rift Valley)। লোহিত সাগরও এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।

৩. নতুন মহাসাগর ও ভূত্বক সৃষ্টি: এই সীমান্তে ক্রমাগত ম্যাগমা সঞ্চিত হয়ে নতুন সামুদ্রিক ভূত্বক তৈরি হয় এবং শৈলশিরার দুপাশে প্রসারিত হতে থাকে। দীর্ঘকাল ধরে এই প্রসারণের ফলে সরু জলভাগ ক্রমশ বিশাল মহাসাগরে পরিণত হয়। আটলান্টিক মহাসাগর এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিসারী বা গঠনকারী পাত সীমানায় মধ্য-সামুদ্রিক শৈলশিরা ও নতুন ভূত্বক গঠনের ডায়াগ্রাম।
চিত্র: প্রতিসারী বা গঠনকারী পাত সীমানা
  • হিমালয় পর্বত: মহাদেশীয়-মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষে সৃষ্ট।
  • জাপান দ্বীপপুঞ্জ: মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় পাতের সংঘর্ষে সৃষ্ট।
  • মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা: প্রতিসারী পাতের চলনে সৃষ্ট।
  • সান-আন্দ্রিজ চ্যুতি: নিরপেক্ষ বা ট্রান্সফর্ম পাতের চলনে সৃষ্ট।

পাত সংস্থান তত্ত্বে ভূমিকম্পের উৎস ও পাতের নিমজ্জন ব্যাখ্যা করতে ‘বেনিয়ফ জোন’ বা ‘বেনিয়ফ মন্ডল’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ১৯৫৪ সালে আমেরিকান সিসমোলজিস্ট বা ভূকম্পবিদ হিউগ বেনিয়ফ (Hugo Benioff) প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূমিকম্পের কেন্দ্রগুলি নিয়ে গবেষণা করার সময় এই বিশেষ অঞ্চলটি চিহ্নিত করেন। তাঁর নামানুসারেই এর নাম রাখা হয় ‘বেনিয়ফ জোন’।

সংজ্ঞা: বিনাশকারী পাত সীমানায় যখন অপেক্ষাকৃত ভারী মহাসাগরীয় পাত এবং হালকা মহাদেশীয় পাতের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে, তখন ভারী মহাসাগরীয় পাতটি মহাদেশীয় পাতের নিচে তির্যকভাবে প্রবেশ করে বা নিমজ্জিত হয়। সংযোগস্থলের যে ঢালু অংশে পাতটি নিমজ্জিত হয় এবং যেখানে ভূমিকম্পের কেন্দ্রগুলি অবস্থান করে, সেই ঢালু অংশটিকে বেনিয়ফ জোন (Benioff Zone) বলা হয়।

অভিসারী বা বিনাশকারী পাত সীমানায় সাবডাকশন জোন এবং বেনিয়ফ জোন (Benioff Zone) সৃষ্টির চিত্র।
চিত্র: সাবডাকশন জোন এবং বেনিয়ফ জোন (Benioff Zone) সৃষ্টির ।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • ১. সৃষ্টি ও অবস্থান: দুটি পাতের সংঘর্ষের ফলে যে ‘সাবডাকশন জোন’ বা অধঃপাত মন্ডল তৈরি হয়, সেখানেই এই বেনিয়ফ জোনের সৃষ্টি হয়। এটি সাধারণত সমুদ্রখাতের সমান্তরালে অবস্থান করে।
  • ২. গভীরতা: এই মন্ডলটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বেশ গভীরে বিস্তৃত থাকে। সাধারণত এর গভীরতা ভূ-অভ্যন্তরে ৫০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৭০০ কিমি পর্যন্তও বিস্তৃত হতে পারে।
  • ৩. নতি বা ঢাল (Slope): নিমজ্জিত পাতটি খাড়াভাবে নিচে নামে না। এটি সাধারণত ৪৫° কোণে (ক্ষেত্রবিশেষে ৪০° থেকে ৯০° পর্যন্ত) হেলে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে।
  • ৪. ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা: এই অঞ্চলে দুটি পাতের প্রবল ঘর্ষণ (Friction) ও চাপের সৃষ্টি হয়। এছাড়া ভূ-গর্ভের উষ্ণতায় শিলা গলে ম্যাগমা তৈরি হয়। এই কারণে বেনিয়ফ জোন অত্যন্ত অস্থির এবং ভূমিকম্পপ্রবণ হয়। পৃথিবীর গভীরতম ভূমিকম্পগুলি (Deep focus earthquakes) মূলত এই অঞ্চলেই সৃষ্টি হয়।

উদাহরণ: প্রশান্ত মহাসাগরীয় আগ্নেয় মেখলা অঞ্চলে বেনিয়ফ জোন সবথেকে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। যেমন—

  • জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ সংলগ্ন অঞ্চল।
  • দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পার্বত্য অঞ্চল এবং পেরু-চিলি খাত বরাবর অঞ্চল।

উত্তর: সংজ্ঞা: দুটি মহাসাগরীয় পাতের অভিসারী চলনের ফলে সমুদ্রবক্ষে ধনুক বা বৃত্তচাপের ন্যায় সারিবদ্ধভাবে যে আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ সৃষ্টি হয়, তাকে বৃত্তচাপীয় দ্বীপমালা বা দ্বীপীয় বৃত্তচাপ (Island Arc) বলে।

উৎপত্তি: প্রধানত দুটি প্রক্রিয়ায় এই দ্বীপমালা গঠিত হয়— ১. পাত সীমানায়: দুটি মহাসাগরীয় পাত পরস্পরের দিকে অগ্রসর হলে, অপেক্ষাকৃত ভারী ও শীতল পাতটি হালকা পাতের নিচে প্রবেশ করে (সাবডাকশন)। গভীরে এই পাতের অংশ গলে ম্যাগমা তৈরি হয় এবং ফাটল দিয়ে বেরিয়ে এসে সমুদ্রতলে জমতে জমতে একসময় জলের ওপরে জেগে দ্বীপ গঠন করে। ২. হটস্পট: অনেক সময় তপ্তবিন্দু বা হটস্পট (Hotspot) থেকে আগ্নেয় পদার্থ বেরিয়ে এসেও এধরণের দ্বীপ সৃষ্টি করে (যেমন—হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ)।

বৈশিষ্ট্য: ১. অবস্থান: এগুলি সর্বদা মহাসাগরীয়-মহাসাগরীয় বিনাশকারী পাত সীমান্তে এবং গভীর সমুদ্রখাতের সমান্তরালে গড়ে ওঠে। ২. প্রকৃতি: এই অঞ্চলগুলি অত্যন্ত অস্থির, তাই এখানে ঘনঘন ভূমিকম্প ও অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। ৩. আকৃতি: মানচিত্রে এদের অবস্থান ধনুক বা বৃত্তের চাপের মতো দেখায়।

উদাহরণ: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। যেমন—

  • জাপান দ্বীপপুঞ্জ
  • ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ (বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপীয় বৃত্তচাপ)
  • ফিলিপাইনস ও অ্যালুশিয়ান দ্বীপপুঞ্জ।

উত্তর:
সংজ্ঞা: ১৯২৮-২৯ সালে ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ আর্থার হোমস (Arthur Holmes) সর্বপ্রথম এই ধারণা দেন। ভূ-অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙনে উৎপন্ন প্রবল তাপে গুরুমন্ডলের সান্দ্র অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে ম্যাগমার যে চক্রাকার বা উল্লম্ব আবর্তনের সৃষ্টি হয়, তাকে পরিচলন স্রোত বলে।

প্রভাব ও গুরুত্ব:
পাত সঞ্চলনে এই স্রোত প্রধান ভূমিকা পালন করে। যেমন—
১. শৈলশিরা গঠন: যেখানে পরিচলন স্রোত ঊর্ধ্বমুখী হয়ে দুই দিকে ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে সামুদ্রিক শৈলশিরা গঠিত হয় (প্রতিসারী পাত সীমানা)।
২. খাত সৃষ্টি: যেখানে দুটি স্রোত মিলিত হয়ে নিম্নমুখী হয়, সেখানে সামুদ্রিক খাত সৃষ্টি হয় (অভিসারী পাত সীমানা)।

উত্তর:
সংজ্ঞা:
পাত সংস্থান তত্ত্ব অনুসারে, অভিসারী পাত সীমানায় দুটি মহাদেশীয় পাতের প্রবল সংঘর্ষের ফলে মাঝখানের সামুদ্রিক অবক্ষেপ ভাঁজ খেয়ে পর্বত গঠন করে এবং পাত দুটি যে রেখা বরাবর পরস্পর যুক্ত হয় বা জোড়া লেগে যায়, তাকে সীবনরেখা (Suture Line) বলে। সহজ কথায়, এটি দুটি মহাদেশীয় পাতের মিলন রেখা।
বৈশিষ্ট্য ও শনাক্তকরণ:
এই রেখা বরাবর ওফিওলাইট (সামুদ্রিক শিলা), লাভা সঞ্চয়, রিকাম্বেন্ট ভাঁজ এবং ন্যাপ (Nappe) দেখা যায়, যা দেখে ভূতাত্ত্বিকরা সীবনরেখাকে চিহ্নিত করেন।
উদাহরণ: হিমালয় পর্বতমালার পশ্চিমাংশে ভারতীয় পাত ও ইউরেশীয় পাতের সংযোগস্থলটি ‘সিন্ধু সীবনরেখা’ (Indus Suture Line) নামে পরিচিত।

সংজ্ঞা: পাত সংস্থান তত্ত্বে, যে বিশেষ ভৌগোলিক বিন্দুতে বা সংযোগস্থলে তিনটি পৃথক টেকটোনিক পাত (Plate) পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, তাকে ত্রিপাত সীমান্ত বা Triple Junction বলা হয়।

উদাহরণ: পৃথিবীতে বেশ কয়েকটি স্থানে এই ধরণের সংযোগস্থল দেখা যায়। যেমন— ১. প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত, নাজকা পাত এবং আন্টার্কটিকা পাতের সংযোগস্থল। ২. লোহিত সাগরের কাছে আরবীয় পাত, নুবিয়ান (আফ্রিকান) পাত এবং সোমালিয়ান পাতের মিলনস্থল (আফার জংশন)।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (আলোকাজেন): একটি আদর্শ ত্রিপাত সীমান্তে তিনটি বাহু বা ফাটল থাকে। সাধারণত এই তিনটি বাহুর মধ্যে দুটি সক্রিয় থাকলেও তৃতীয় বাহুটি অনেক সময় নিষ্ক্রিয় বা অচল হয়ে পড়ে। ত্রিপাত সীমান্তের এই নিষ্ক্রিয় বা ব্যর্থ বাহুটিকে ভূ-তত্ত্বের ভাষায় ‘আলোকাজেন’ (Aulacogen) বা ‘Failed Rift’ বলা হয়।

উত্তর: প্রতিসারী পাত সীমানাকে ‘গঠনকারী’ বা ‘গঠনাত্মক’ পাত সীমানা বলার প্রধান কারণ হলো নতুন ভূত্বকের সৃষ্টি। বিষয়টি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ফাটল সৃষ্টি: এই পাত সীমানায় দুটি পাত পরস্পর থেকে বিপরীত দিকে সরে যায়, ফলে মাঝখানে ফাটল বা স্থানচ্যুতির সৃষ্টি হয়।

২. ম্যাগমার আগমন: ওই ফাটল পথ দিয়ে ভূ-অভ্যন্তরের অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার থেকে উত্তপ্ত ম্যাগমা বেরিয়ে এসে শীতল ও কঠিন হয়।

৩. নতুন ভূত্বক গঠন: ম্যাগমা জমার ফলে সমুদ্রবক্ষে নতুন শিলাস্তর বা নতুন ভূত্বক (New Crust) গঠিত হয়।

যেহেতু এই সীমানায় পুরনো ভূত্বক ধ্বংস হয় না, বরং সর্বদা নতুন ভূমিরূপ বা ভূত্বক গঠিত হয়, তাই একে গঠনকারী পাত সীমানা বলা হয়।

উদাহরণ: আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যবর্তী অংশ, যেখানে নতুন ভূত্বক গঠিত হয়ে মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরার সৃষ্টি হয়েছে।

উত্তর: অভিসারী পাত সীমানাকে ‘ধ্বংসাত্মক’ বা ‘বিনাশকারী’ পাত সীমানা বলার মূল কারণ হলো ভূত্বকের বিনাশ বা ধ্বংস। কারণটি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

১. পাতের সংঘর্ষ ও নিমজ্জন: এই সীমানায় দুটি পাত পরস্পরের মুখোমুখি অগ্রসর হয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তখন অপেক্ষাকৃত ভারী পাতটি হালকা পাতের নিচে বা অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে প্রবেশ করে।

২. ভূত্বকের বিনাশ: ভূ-অভ্যন্তরের প্রবল উষ্ণতায় ওই নিমজ্জিত পাতের অগ্রভাগ গলে যায় এবং ম্যাগমায় পরিণত হয়।

৩. উপসংহার: যেহেতু এই সীমান্তে পাতের কিছু অংশ গলে গিয়ে সর্বদা ভূত্বকের বিনাশ ঘটে, তাই একে ধ্বংসাত্মক বা বিনাশকারী পাত সীমানা বলা হয়।

উদাহরণ: দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত ও আন্টার্কটিকা পাতের সংযোগস্থল হলো একটি ধ্বংসাত্মক পাত সীমানার উদাহরণ।

উত্তর: সংজ্ঞা: দুটি মহাদেশীয় ভূখণ্ডের মধ্যবর্তী সুদীর্ঘ, সংকীর্ণ, অগভীর এবং ক্রমনিমজ্জমান (ক্রমাগত নিচে বসে যাওয়া) অবনমিত জলভাগকে মহীখাত বা জিওসিনক্লাইন (Geosyncline) বলে।

গুরুত্ব: ভূবিজ্ঞানী কোবারের মতে, মহীখাত হলো ‘ভঙ্গিল পর্বতের দোলনা’। দীর্ঘকাল ধরে ক্ষয়জাত পলি এই খাতে জমা হয় এবং পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ডের প্রবল চাপে সেই পলি ভাঁজ খেয়ে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি করে।

উদাহরণ: প্রাচীন টেথিস মহীখাত-এর পলিরাশি ভাঁজ খেয়েই বর্তমানের হিমালয় পর্বতের সৃষ্টি হয়েছে।

📥 Download PDF Now

FAQ

প্রশ্ন: প্রতিসারী পাত সীমানাকে গঠনকারী পাত সীমানা (Constructive Plate Boundary) বলা হয় কেন?

উত্তর: প্রতিসারী পাত সীমানাকে 'গঠনকারী' বা 'গঠনাত্মক' পাত সীমানা বলার প্রধান কারণ হলো নতুন ভূত্বকের সৃষ্টি। বিষয়টি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

প্রশ্ন: অভিসারী পাত সীমানাকে ধ্বংসাত্মক বা বিনাশকারী পাত সীমানা (Destructive Plate Boundary) বলা হয় কেন?

উত্তর: অভিসারী পাত সীমানাকে 'ধ্বংসাত্মক' বা 'বিনাশকারী' পাত সীমানা বলার মূল কারণ হলো ভূত্বকের বিনাশ বা ধ্বংস। কারণটি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো....

প্রশ্ন: পরিচলন স্রোত (Convection Current)

উত্তর: ১৯২৮-২৯ সালে ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ আর্থার হোমস (Arthur Holmes) সর্বপ্রথম এই ধারণা দেন। ভূ-অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙনে উৎপন্ন প্রবল তাপে গুরুমন্ডলের সান্দ্র অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে ম্যাগমার যে চক্রাকার বা উল্লম্ব আবর্তনের সৃষ্টি হয়, তাকে পরিচলন স্রোত বলে।

প্রশ্ন: ত্রিপাত সীমান্ত বা ত্রিপাত সংযোগস্থল (Triple Plate Junction)

উত্তর: পাত সংস্থান তত্ত্বে, যে বিশেষ ভৌগোলিক বিন্দুতে বা সংযোগস্থলে তিনটি পৃথক টেকটোনিক পাত (Plate) পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, তাকে ত্রিপাত সীমান্ত বা Triple Junction বলা হয়।

Please Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!