CLASS VI-VIII GEOGRAPHYClass 8

বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ: অষ্টম শ্রেণি ভূগোল (সহজ নোটস) | Class 8 বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ

Table of Contents

🌍 কখনও ভেবেছো, কেন পৃথিবীর কিছু জায়গায় সবসময় বৃষ্টি হয়, আবার কোথাও মরুভূমি?

👉 এর মূল কারণ হলো বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ

এই পোস্টে আমরা খুব সহজভাবে জানবো—
✔ বায়ুচাপ বলয় কী
✔ পৃথিবীতে কত ধরনের চাপ বলয় আছে
✔ বায়ু কীভাবে প্রবাহিত হয়

আমাদের চারপাশের অদৃশ্য বায়ুর ওজন আছে এবং তা পৃথিবীর ওপর চাপ দেয়। এই বায়ুচাপ পৃথিবীর সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও চাপ বেশি (উচ্চচাপ), আবার কোথাও কম (নিম্নচাপ)। এই বায়ুচাপের পার্থক্যই হলো বায়ুপ্রবাহের মূল কারণ। চলো, আজ আমরা বায়ুচাপ বলয় এবং বায়ুপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

সমগ্র পৃথিবী জুড়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে সমধর্মী বায়ুস্তর অনুভূমিকভাবে কয়েক হাজার কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে পৃথিবীকে কয়েকটি বলয় বা বেল্টের আকারে বেষ্টন করে আছে। এদেরকেই বায়ুচাপ বলয় (Pressure Belts) বলা হয়।

“বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ MCQ এবং শর্ট প্রশ্ন-উত্তর পড়তে এখানে ক্লিক করো।”

বাণিজ্য বায়ু, পশ্চিমালী বায়ু ও মেরু পূর্বালী বায়ু সহ বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের চিত্র (Global Wind System Diagram in Bengali) | webbhugol
পৃথিবীর প্রধান বায়ুপ্রবাহ—বাণিজ্য বায়ু, পশ্চিমালী বায়ু ও মেরু পূর্বালী বায়ুর সহজ চিত্র

👉 কোথাও উচ্চচাপ, কোথাও নিম্নচাপ—এই পার্থক্যই বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি করে।

পৃথিবীতে মোট ৭টি বায়ুচাপ বলয় রয়েছে। নিচে এগুলোর অবস্থান ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:

১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (০° থেকে ৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ):

  • বৈশিষ্ট্য: নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় এখানকার বায়ু উষ্ম ও হালকা হয়ে ওপরের দিকে উঠে যায়। তাই এখানে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়।
  • ডোলড্রামস (Doldrums): বায়ু সোজা ওপরে ওঠায় এখানে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে কোনো বায়ু বয় না। তাই এই অঞ্চলকে নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রামস (যার অর্থ শান্ত অবস্থা) বলে।

২. কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় (২৫° থেকে ৩৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ):

  • বৈশিষ্ট্য: নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে ওঠা বায়ু এবং মেরু অঞ্চল থেকে আসা শীতল বায়ু এই দুই ক্রান্তীয় অঞ্চলে নেমে এসে মিলিত হয়। ফলে বায়ুর ঘনত্ব ও চাপ বেড়ে গিয়ে উচ্চচাপ বলয়ের সৃষ্টি করে।
  • অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitudes): প্রাচীনকালে পালতোলা জাহাজগুলো এই শান্তবলয়ে এসে গতিহীন হয়ে পড়ত। জাহাজের ভার কমাতে নাবিকরা জীবন্ত ঘোড়া আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলে দিত। তাই এই অঞ্চল ‘অশ্ব অক্ষাংশ’ নামে পরিচিত।
  • 💡 জানো কি? আগে এখানে জাহাজ আটকে যেত, তাই ঘোড়া ফেলে দিতে হত!

৩. সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (৬০° থেকে ৭০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ):

  • বৈশিষ্ট্য: মেরু অঞ্চলের তুলনায় এই অঞ্চলের উষ্মতা কিছুটা বেশি থাকায় বায়ু হালকা হয়ে ওপরে ওঠে এবং দুই দিকে বিক্ষিপ্ত হয়। ফলে এখানে বায়ুর পরিমাণ কমে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়।

৪. সুমেরু ও কুমেরু উচ্চচাপ বলয় (৮০° থেকে ৯০° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশ):

  • বৈশিষ্ট্য: দুই মেরু অঞ্চল সারাবছর বরফে ঢাকা থাকে। তাই এখানকার বাতাস ভীষণ শীতল ও ভারী হয়, যা উচ্চচাপ বলয় তৈরি করে।

বায়ু সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। চাপের সমতা বজায় রাখাই এর প্রধান উদ্দেশ্য। চাপের পার্থক্য বেশি হলে ঝোড়ো হাওয়া বয়, আর পার্থক্য কম হলে শান্ত হাওয়া বয়।

👉 চাপের পার্থক্য যত বেশি, বায়ুর গতি তত বেশি।

গুরুত্বপূর্ণ দুটি সূত্র:

  • কোরিওলিস বল ও ফেরেলের সূত্র: পৃথিবীর আবর্তনের কারণে বায়ু সোজাপথে না গিয়ে উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়। একেই ফেরেলের সূত্র বলে।
  • বাইস ব্যালট সূত্র: উত্তর গোলার্ধে বায়ুর গতির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালে ডানদিকে উচ্চচাপ এবং বাঁদিকে নিম্নচাপ থাকে।

যে বায়ু সারাবছর ধরে নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট দিকে ও নির্দিষ্ট গতিতে প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু (Planetary Winds) বলে। বায়ুচাপ বলয়গুলোর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করেই তিন ধরনের নিয়ত বায়ু প্রবাহিত হয়:

পৃথিবীর নিয়ত বায়ুপ্রবাহের চিত্র - বাণিজ্য বায়ু, পশ্চিমালী বায়ু এবং মেরু বায়ুর উৎপত্তি ও গতিপথ (Planetary Wind System in Bengali) | webbhugol
পৃথিবীর প্রধান তিনটি নিয়ত বায়ু: বাণিজ্য বায়ু, পশ্চিমালী বায়ু ও মেরু বায়ু এবং বায়ুচাপ বলয়ের সাথে এদের সম্পর্ক।

১. আয়ন বায়ু (Trade Winds):

  • প্রবাহপথ: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে প্রবাহিত হয়।
  • বৈশিষ্ট্য: উত্তর গোলার্ধে এটি ‘উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু’ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ‘দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু’ নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে এই বায়ুর ওপর নির্ভর করে বাণিজ্য চলত বলে একে বাণিজ্য বায়ু-ও বলা হয়।
  • ITCZ: নিরক্ষীয় অঞ্চলে যেখানে দুই গোলার্ধের আয়ন বায়ু মিলিত হয়, তাকে আন্তঃক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল বা ITCZ বলে।

২. পশ্চিমা বায়ু (Westerlies):

  • প্রবাহপথ: কর্কটীয় ও মকরীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে যথাক্রমে সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে এই বায়ু প্রবাহিত হয়।
  • বৈশিষ্ট্য: দক্ষিণ গোলার্ধে জলভাগ বেশি থাকায় এই বায়ু প্রচণ্ড বেগে বয়। তাই দক্ষিণ গোলার্ধে ৪০°, ৫০° ও ৬০° অক্ষাংশে একে যথাক্রমে গর্জনশীল চল্লিশা, ক্রোধোন্মত্ত পঞ্চাশ এবং তীক্ষ্ণ চিৎকারকারী ষাট বলা হয়।

৩. মেরু বায়ু (Polar Winds):

  • প্রবাহপথ: দুই মেরুদেশীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের দিকে এই অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়।
  • বৈশিষ্ট্য: এই বায়ুর প্রভাবে মেরুবৃত্ত অঞ্চলে মাঝে মাঝেই প্রবল তুষারঝড় দেখা যায়।

  • সাময়িক বায়ু: নির্দিষ্ট ঋতু বা সময়ে প্রবাহিত বায়ু। যেমন: সমুদ্রবায়ু (দিনে সমুদ্র থেকে স্থলে) এবং স্থলবায়ু (রাতে স্থল থেকে সমুদ্রে)। এই দুই বায়ুর বৃহৎ সংস্করণ হলো আমাদের চেনা মৌসুমি বায়ু
  • পার্বত্য বায়ু: দিনে উপত্যকা থেকে পাহাড়ে ওঠা বায়ুকে অ্যানাবেটিক বায়ু এবং রাতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামা শীতল বায়ুকে ক্যাটাবেটিক বায়ু বলে।
  • আকস্মিক বায়ু: হঠাৎ চাপের পার্থক্যের কারণে সৃষ্টি হওয়া বায়ু। যেমন: ঘূর্ণবাত (কেন্দ্রে নিম্নচাপ) এবং প্রতীপ ঘূর্ণবাত (কেন্দ্রে উচ্চচাপ)।

🌊 সমুদ্রবায়ু (Sea Breeze)

  • দিনে সমুদ্র → স্থল
  • ঠান্ডা ও আরামদায়ক

🌍 স্থলবায়ু (Land Breeze)

  • রাতে স্থল → সমুদ্র

🌧️ মৌসুমী বায়ু (Monsoon Wind)

👉 ঋতু পরিবর্তনের কারণে প্রবাহিত হয়

✔ গ্রীষ্মে → সমুদ্র থেকে স্থল → বৃষ্টি
✔ শীতে → স্থল থেকে সমুদ্র → শুষ্ক

✔ ডোলড্রামস কী?
✔ অশ্ব অক্ষাংশ কেন বলা হয়?
✔ কোরিওলিস বল কী?
✔ আয়ন বায়ু কোন দিক থেকে প্রবাহিত হয়?

📚 আরও পড়ো

👉অষ্টম শ্রেণী শিলা ও খনিজ MCQ প্রশ্ন উত্তর

❓ FAQ: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ

১. বায়ুচাপ বলয় কী?

পৃথিবীর উপর সমধর্মী বায়ুচাপ বিশিষ্ট অঞ্চলগুলো বেল্ট বা বলয়ের মতো বিস্তৃত থাকে—এগুলোকেই বায়ুচাপ বলয় বলা হয়।

২. পৃথিবীতে কয়টি প্রধান বায়ুচাপ বলয় আছে?

মোট ৭টি প্রধান বায়ুচাপ বলয় রয়েছে—
✔ ১টি নিরক্ষীয় নিম্নচাপ
✔ ২টি উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ
✔ ২টি উপ-মেরু নিম্নচাপ
✔ ২টি মেরু উচ্চচাপ

৩. বায়ুপ্রবাহ কেন হয়?

বায়ু সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। চাপের পার্থক্যই বায়ুপ্রবাহের মূল কারণ।

৪. নিয়ত বায়ু (Planetary Winds) কী?

যে বায়ু সারাবছর নির্দিষ্ট দিকে ও গতিতে প্রবাহিত হয়, তাকে নিয়ত বায়ু বলা হয়।

৫. নিয়ত বায়ু কয় প্রকার ও কী কী?

৩ প্রকার—
✔ বাণিজ্য বায়ু (Trade Winds)
✔ পশ্চিমালী বায়ু (Westerlies)
✔ মেরু বায়ু (Polar Winds)

৬. বাণিজ্য বায়ু কোথা থেকে কোথায় প্রবাহিত হয়?

উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (৩০°) থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (০°)-এর দিকে প্রবাহিত হয়।

৭. পশ্চিমালী বায়ুর বৈশিষ্ট্য কী?

৩০° থেকে ৬০° অক্ষাংশে প্রবাহিত হয় এবং দক্ষিণ গোলার্ধে অত্যন্ত প্রবল বেগে বয়।

৮. মেরু বায়ু কেমন ধরনের বায়ু?

এটি অত্যন্ত শীতল ও শুষ্ক বায়ু, যা মেরু উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে উপ-মেরু নিম্নচাপ অঞ্চলে প্রবাহিত হয়।

৯. ডোলড্রামস (Doldrums) কী?

👉 নিরক্ষীয় অঞ্চলে যেখানে বায়ু উপরের দিকে উঠে যায় এবং ভূপৃষ্ঠে প্রায় কোনো বায়ুপ্রবাহ থাকে না, সেই শান্ত অঞ্চলকে ডোলড্রামস বলা হয়।

১০. অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitudes) কেন বলা হয়?

এই অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহ খুব কম থাকায় জাহাজ আটকে যেত, তাই অতীতে নাবিকরা ঘোড়া ফেলে দিত—সেখান থেকেই নামটি এসেছে।

১১. কোরিওলিস বল কী?

👉 পৃথিবীর আবর্তনের কারণে বায়ু সোজা পথে না গিয়ে বাঁক নেয়—এই প্রভাবকে কোরিওলিস বল বলে।

১২. ITCZ কী?

👉 নিরক্ষীয় অঞ্চলে যেখানে দুই গোলার্ধের বাণিজ্য বায়ু মিলিত হয়, তাকে ITCZ (Inter Tropical Convergence Zone) বলা হয়।





Please Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!