পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা: শ্রেণীবিভাগ, বৈশিষ্ট্য ও বন্টন | West Bengal Soil – Class 9 & Competitive Exams
ভূমিকা পশ্চিমবঙ্গ একটি নদীমাতৃক রাজ্য হলেও এর ভূপ্রকৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই বৈচিত্র্য দেখা যায় এর মৃত্তিকা বা মাটিতে। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল থেকে দক্ষিণের উপকূলবর্তী অঞ্চল—সর্বত্র মাটির রূপ আলাদা। নবম শ্রেণীর ভূগোলের সিলেবাস এবং বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা (Soil of West Bengal) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজকের এই নিবন্ধে আমরা পশ্চিমবঙ্গের মাটির শ্রেণীবিভাগ, বৈশিষ্ট্য এবং কোন মাটিতে কী ফসল ভালো হয়, তা বিস্তারিত আলোচনা করব।
🗺️ পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকার শ্রেণীবিভাগ
ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু এবং আদি শিলার ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকাকে প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- ১. উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের মৃত্তিকা (Mountain Soil)
- ২. তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চলের মৃত্তিকা (Terai Soil)
- ৩. সমভূমি অঞ্চলের পলি মৃত্তিকা (Alluvial Soil)
- ৪. পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলের ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা (Laterite Soil)
- ৫. উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মৃত্তিকা (Saline Soil)
১. উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের মৃত্তিকা (Mountain Soil)
দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার পার্বত্য এলাকায় এই মাটি দেখা যায়।
উৎপত্তি ও ‘হার্ডপ্যান’ গঠন: এই অঞ্চলে অত্যধিক বৃষ্টিপাতের ফলে মাটির উপরের স্তরের লোহা, ক্যালশিয়াম ও পটাশিয়াম ধুয়ে নিচের স্তরে চলে যায়। এর ফলে নিচের স্তরে একটি শক্ত আস্তরণ বা ‘হার্ডপ্যান’ (Hardpan) তৈরি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে পডজলাইজেশন বলে এবং এই মাটিকে পডজল (Podzol) মাটি বলা হয়।
- বৈশিষ্ট্য: এই মাটিতে জৈব পদার্থ বা হিউমাস বেশি থাকে কিন্তু ফসফরাস ও পটাশ কম থাকে। এই মাটি সাধারণত অম্লধর্মী (Acidic) এবং রঙ কালো বা গাঢ় বাদামী হয়। একে পডজল (Podzol) মৃত্তিকাও বলা হয়।
- চাষাবাদ: এই মাটি চা, সিঙ্কোনা, কমলালেবু এবং এলাচ চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী।
২. তরাই ও ডুয়ার্স অঞ্চলের মৃত্তিকা
উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলের ঠিক নিচেই জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহার জেলার উত্তরাংশে এই মাটি দেখা যায়।
- বৈশিষ্ট্য: নুড়ি, পাথর ও বালি মিশ্রিত এই মাটি খুব একটা উর্বর নয়। এতে নাইট্রোজেন ও জৈব পদার্থ যথেষ্ট থাকে।
- চাষাবাদ: এখানে চা, আনারস এবং ধান চাষ ভালো হয়।
৩. সমভূমি অঞ্চলের পলি মৃত্তিকা (Alluvial Soil)
পশ্চিমবঙ্গের সবথেকে বেশি এলাকা জুড়ে এই উর্বর পলি মাটি অবস্থিত। উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের বিস্তীর্ণ অংশে এই মাটি দেখা যায়। পলি মাটিকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
শ্রেণীবিভাগ ও অবস্থান: গঠন ও অবস্থান অনুযায়ী পলিমাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- নবীন পলি মাটি / খাদার (Khadar): নদী তীরবর্তী অঞ্চলের নবীন বা নতুন পলিমাটিকে ‘খাদার’ বলা হয়। এটি অত্যন্ত উর্বর।পলি মাটিতে পটাশ ও চুন বেশি থাকে কিন্তু নাইট্রোজেন ও হিউমাস কম থাকে।ধান, গম, পাট, আলু, তিল এবং বিভিন্ন শাকসবজি চাষের জন্য এই মাটি সেরা।
- প্রাচীন পলি মাটি / ভাঙ্গর (Bhangar): নদী থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের প্রাচীন পলিমাটিকে ‘ভাঙ্গর’ বলা হয়।দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা ও বীরভূমের কিছু অংশে দেখা যায়। এই মাটি কাদা ও এঁটেল প্রকৃতির এবং কিছুটা কম উর্বর। স্থানীয় ভাষায় একে ‘বারিন্দ’ বলা হয়।
- ভাবর (Bhabar): হিমালয়ের পাদদেশ অর্থাৎ তরাই অঞ্চলের নুড়ি ও কাঁকর যুক্ত পলিমাটিকে ‘ভাবর’ বলা হয়। এটি প্রধানত দার্জিলিং-এর পাদদেশ এবং জলপাইগুড়িতে দেখা যায়।
৪. পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলের ল্যাটেরাইট মৃত্তিকা (Laterite Soil)
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, এবং বীরভূম ও বর্ধমানের পশ্চিমাংশে এই মাটি দেখা যায়।
উৎপত্তি ও নামকরণ: ল্যাটিন শব্দ ‘ল্যাটার’ (Later) এর অর্থ হলো ‘ইট’। এই মাটি ইটের মতোই শক্ত এবং লাল রঙের হয় বলে একে ল্যাটেরাইট মাটি বলা হয়। রাসায়নিক আবহবিকারের ফলে প্রাচীন শিলা থেকে সিলিকা অপসারিত হয়ে লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড পড়ে থাকে, যা কালক্রমে এই মাটিতে পরিণত হয়।
- বৈশিষ্ট্য: লোহা বা আয়রন অক্সাইডের উপস্থিতির জন্য এই মাটির রঙ ইট লাল হয়। এটি অম্লধর্মী এবং এতে মৌচাকের মতো ছিদ্র দেখা যায়। জলধারণ ক্ষমতা খুব কম। কাকর যুক্ত হওয়ায় একে স্থানীয় ভাষায় ‘কাঁকুরে মাটি’ বলা হয়।
- চাষাবাদ: এই মাটি খুব একটা উর্বর নয়। তবে জলসেচের সাহায্যে এখানে জোয়ার, বাজরা, ভুট্টা, ডাল এবং বাদাম চাষ করা হয়।
৫. উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত মৃত্তিকা (Saline Soil)
দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকা এবং সুন্দরবন অঞ্চলে এই মাটি দেখা যায়।
অবস্থান: দক্ষিণ ২৪ পরগনার প্রায় সমগ্র অংশ, উত্তর ২৪ পরগনার দক্ষিণ অংশ এবং পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূলবর্তী এলাকায় এই মাটি দেখা যায়।
উৎপত্তি: নদী ও সমুদ্রের পলি এবং সুন্দরবন অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ অরণ্যের লতাপাতা পচে এই মাটি তৈরি হয়েছে। নিয়মিত জোয়ারের জল প্রবেশের ফলে মাটিতে লবণের ভাগ খুব বেশি।
- বৈশিষ্ট্য: জোয়ারের জল প্রবেশ করার ফলে এই মাটিতে সোডিয়াম ক্লোরাইড ও ম্যাগনেসিয়াম ক্লোরাইডের পরিমাণ খুব বেশি। তাই এই মাটি অত্যন্ত লবণাক্ত।
- চাষাবাদ: এখানে নারকেল, সুপারি, তরমুজ এবং কাজুবাদাম ভালো হয়। এছাড়া বর্তমানে বিশেষ প্রযুক্তিতে ধান চাষও করা হচ্ছে।

🎓 চাকরির পরীক্ষার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (Exam Special One-Liners)
পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ WBCS, WB Police, এবং TET পরীক্ষার্থীদের জন্য নিচের তথ্যগুলো অত্যন্ত জরুরি:
- প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গের কোন ধরনের মৃত্তিকা সবথেকে বেশি দেখা যায়?
- উত্তর: পলি মৃত্তিকা (প্রায় ৯০% এলাকা জুড়ে)।
- প্রশ্ন: ‘ভাঙ্গর’ (Bhangar) ও ‘খাদার’ (Khadar) কী?
- উত্তর: প্রাচীন পলি মাটিকে ‘ভাঙ্গর’ এবং নবীন পলি মাটিকে ‘খাদার’ বলা হয়।
- প্রশ্ন: ল্যাটেরাইট মাটির রঙ লাল হয় কেন?
- উত্তর: প্রচুর পরিমাণে লৌহ বা আয়রন অক্সাইড থাকার কারণে।
- প্রশ্ন: ‘বারিন্দ’ বা ‘বরেন্দ্রভূমি’ কোথায় দেখা যায়?
- উত্তর: মালদা ও দক্ষিণ দিনাজপুরে (প্রাচীন পলিগঠিত অঞ্চল)।
- প্রশ্ন: সুন্দরবন অঞ্চলের মাটির প্রকৃতি কেমন?
- উত্তর: শরীরবৃত্তীয় শুষ্ক মৃত্তিকা বা ফিজিওলজিক্যালি ড্রাই সয়েল (Physiologically Dry Soil)।
- কালান্তর → মুর্শিদাবাদ; পলিমাটি; ধান–পাটে উপযোগী
- ঘুটিং → বাঁকুড়া–বীরভূম; লাল-লেটারাইট; কম উর্বর
- বানমাটি → পূর্ব মেদিনীপুর; বালুমাটি; জলধারণ কম
- বাঘা এঁটেল → বীরভূম; এঁটেল কাদামাটি; ধান-সবজিতে উপযোগী
🎓ক্যুইজ পর্ব: পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা (20 MCQ)
🌱 পশ্চিমবঙ্গের মৃত্তিকা কুইজ
20 টি প্রশ্ন • পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল বিশেষ কুইজ
🎉 তোমার স্কোর: /20
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকাজ এবং অর্থনীতিতে এখানকার বৈচিত্র্যময় মৃত্তিকার গুরুত্ব অপরিসীম। নবম শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য যেমন এই মাটির শ্রেণীবিভাগ বোঝা জরুরি, তেমনই চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মাটির স্থানীয় নাম এবং বৈশিষ্ট্যগুলো মনে রাখা প্রয়োজন।
আশা করি, Webbhugol.com-এর এই নিবন্ধটি তোমাদের প্রস্তুতির জন্য সহায়ক হবে। ভূগোল ও চাকরির প্রস্তুতির আরও আপডেটের জন্য আমাদের পেজে নিয়মিত চোখ রাখুন।
West Bengal Geography
Indian Geography
- ভারতের ভূ-গঠন (Physiography of India)
- ভারতের জলবায়ু (Climate of India)
- ভারতের মৃত্তিকা (Soils of India)
- ভারতের নদী ব্যবস্থা (Drainage System)
ভাবর কী?
Ans: তরাই অঞ্চলের নুড়ি ও কাঁকর মেশা মাটিকে ভাবর বলে।
ল্যাটেরাইট মাটির রং লাল কেন?
Ans: লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের উপস্থিতির কারণে।
ভারতের মাটি গবেষণাগার কোথায়?
Ans : উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে (Dehradun) / ভূপাল (Bhupal)
