ডেভিসের স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র ও পুনর্যৌবন লাভ: বাধা ও সৃষ্ট ভূমিরূপ – নোটস | Class 12 Semester 4
Webbhugol.com এর আজকের এই পোস্টে আমরা দ্বাদশ শ্রেণীর চতুর্থ সেমিস্টারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ডেভিসের স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র ও পুনর্যৌবন লাভ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। আপনি চাইলে এর সম্পূর্ণ নোটসটি Pdf ডাউনলোড করতে পারবেন।
ভূমিকা: ভূমিরূপবিদ্যার ইতিহাসে যে কটি তত্ত্ব সবথেকে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো উইলিয়াম মরিস ডেভিসের (W.M. Davis) ‘স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র‘ মতবাদ। জেমস হার্টন-এর ‘চক্রীয় ধারণা’ এবং চার্লস ডারউইনের ‘বিবর্তনবাদ’-এ অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৯৯ সালে আমেরিকান ভূতত্ত্ববিদ ডব্লিউ. এম. ডেভিস তাঁর বিখ্যাত ‘জিওগ্রাফিক্যাল এসেজ’ (Geographical Essays) গ্রন্থে এই ধ্রুপদী মতবাদটি উপস্থাপন করেন।
ডেভিসের মতে, “ভূমিরূপের একটি নির্দিষ্ট জীবন ইতিহাস আছে” (Landforms have a life history)। মানুষের জীবনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, মানুষের জীবনের অনুরূপ ভূমিরূপও জন্ম, যৌবন, পরিণতি এবং বার্ধক্য অবস্থার মধ্য দিয়ে গিয়ে অবশেষে বিনাশ লাভ করে।
ডেভিসের ত্রয়ী (Trio of Davis)
ডেভিস তাঁর তত্ত্বে বলেন, “Landscape is a function of structure, process and stage.” অর্থাৎ, কোনো অঞ্চলের ভূমিরূপ হলো সেই অঞ্চলের শিলালক্ষণ বা গঠন, ক্ষয়কারী প্রক্রিয়া এবং সময়ের বা পর্যায়ের ফলশ্রুতি। এই তিনটি উপাদানকে একত্রে ‘ডেভিসের ত্রয়ী’ বা Davisian Trio বলা হয়।
১. গঠন (Structure): শিলার প্রকৃতি, কাঠিন্য, গ্রথন , গঠন,প্রবেশ্যতা, নতি, ভাঁজ ও চ্যুতি সহ শিলালক্ষণকে বোঝায়।
২. প্রক্রিয়া (Process): প্রক্রিয়া বলতে ভূপৃষ্ঠে ক্রিয়াশীল প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে বোঝায় (যেমন—নদী, আবহাওয়া)। ডেভিসের মতে আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে ‘নদী’ হলো প্রধান শক্তি।
৩. পর্যায় (Stage): ভূমিরূপ বিবর্তনের সময়কালকে বোঝায় (যৌবন, পরিণত ও বার্ধক্য)।
ডেভিসের তত্ত্বের পূর্বশর্ত বা অনুমানসমূহ (Premises)
ডেভিস তাঁর স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি শর্ত বা অনুমানের অবতারণা করেন:
- উত্থিত ভূমিভাগ: ক্ষয়চক্র শুরুর পূর্বে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে একটি বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের উত্থান ঘটবে।
- দ্রুত উত্থান: এই ভূমিভাগের উত্থান খুব অল্প সময়ের মধ্যে এবং দ্রুত সম্পন্ন হবে।
- উত্থান ও ক্ষয়ের সম্পর্ক: ভূমিভাগের উত্থান পর্ব সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষয়কার্য শুরু হবে না।
- ভূ-গাঠনিক স্থিতিশীলতা: ক্ষয়কার্য চলাকালীন ভূমিভাগের আর কোনো উত্থান বা পতন ঘটবে না, অর্থাৎ সমগ্র ভূমিভাগটি স্থিতিশীল থাকবে।
- শিলার গঠন: অঞ্চলটি গাঠনিক দিক থেকে কঠিন ও কোমল শিলার সমন্বয়ে গঠিত হবে।
ক্ষয়চক্রের পর্যায়সমূহ ও সৃষ্ট ভূমিরূপ
ডেভিসের স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র তত্ত্বে ভূমিরূপের বিবর্তনকে মানুষের জীবনচক্রের সাথে তুলনা করে তিনটি প্রধান পর্যায়ে ভাগ করেছেন। নিচে আলোচনা করা হলো:
১. যৌবন পর্যায় (Youthful Stage)
উত্থান শেষ হওয়ার পর এই পর্যায় শুরু হয়।
বৈশিষ্ট্য:
- এই পর্যায়ে ভূমির প্রারম্ভিক ঢাল অনুসারে অনুগামী নদী (Consequent Stream) সৃষ্টি হয়।
- নদীর স্রোতের বেগ খুব বেশি থাকে এবং নিম্নক্ষয় সবথেকে বেশি হয়।
- পার্শ্বক্ষয় বিশেষ হয় না।
- নদী উপত্যকা খুব গভীর ও সংকীর্ণ হয়।
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
- ‘I’ ও ‘V’ আকৃতির উপত্যকা: প্রবল নিম্নক্ষয়ের ফলে নদী উপত্যকা ইংরেজি ‘I’ বা গভীর ‘V’ আকৃতির হয় (গিরিখাত ও ক্যানিয়ন)।
- জলপ্রপাত ও খরস্রোত: কঠিন ও কোমল শিলা অবস্থান করলে নদীর গতিপথে জলপ্রপাত সৃষ্টি হয়।
- নদীগ্রাস: শক্তিশালী নদী তার মস্তকমুখী ক্ষয়ের মাধ্যমে অন্য নদীকে গ্রাস করে।
২. পরিণত পর্যায় (Mature Stage)
এই পর্যায়ে নদীগুলি উপত্যকার গভীরতা অপেক্ষা প্রস্থ বা চওড়া বেশি বাড়াতে থাকে।
বৈশিষ্ট্য:
- নিম্নক্ষয় কমে যায় এবং পার্শ্বক্ষয় বৃদ্ধি পায়।
- নদী উপত্যকা প্রশস্ত হতে শুরু করে (U আকৃতির ন্যায়)।
- জলবিভাজিকাগুলি স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ শৈলশিরার মতো অবস্থান করে।
- প্রধান নদীগুলোতে ‘পর্যায়িত ঢাল’ (Graded Profile) তৈরি হয়, অর্থাৎ ক্ষয় ও সঞ্চয়ের মধ্যে ভারসাম্য আসে।
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
- নদীবাঁক (Meander): পার্শ্বক্ষয়ের ফলে নদী এঁকেবেঁকে প্রবাহিত হয়।
- প্লাবনভূমি (Floodplain): উপত্যকা চওড়া হওয়ায় বন্যার জল দুপাশে ছড়িয়ে প্লাবনভূমি গঠন করে।
- প্রশস্ত উপত্যকা: উপত্যকাগুলি বেশ চওড়া ও খাড়া পাড় যুক্ত হয়।
৩. বার্ধক্য পর্যায় (Old Stage)
এটি ক্ষয়চক্রের অন্তিম পর্যায়। বৈশিষ্ট্য:
- নিম্নক্ষয় প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, শুধুমাত্র সামান্য পার্শ্বক্ষয় ও মূলত সঞ্চয় কাজ চলে।
- নদীর শক্তি কমে যায় এবং অসংখ্য অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ দেখা যায়।
- সমগ্র অঞ্চলটি সমুদ্রতলের প্রায় সমান উচ্চতায় (Base Level of Erosion) নেমে আসে।
সৃষ্ট ভূমিরূপ:
- সমপ্রায়ভূমি (Peneplain): দীর্ঘকালীন ক্ষয়ের ফলে উঁচু ভূমিভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে যে মৃদু ঢালযুক্ত তরঙ্গায়িত প্রায়-সমতলভূমির সৃষ্টি করে, তাকে সমপ্রায়ভূমি বা পেনেপ্লেন বলে। ‘Pene’ অর্থ ‘প্রায়’ এবং ‘Plain’ অর্থ ‘সমভূমি’।
- মোনাডনক (Monadnock): সমপ্রায়ভূমির বুকে অপেক্ষাকৃত কঠিন শিলাগুলি ক্ষয় প্রতিরোধ করে টিলার আকারে দাঁড়িয়ে থাকে। এদের মোনাডনক বলে। (আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের মাউন্ট মোনাডনক-এর নামানুসারে)।
- অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ: নদীখাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ অবস্থান করে।
ক্ষয়চক্রের ব্যাঘাত ও পুনর্যৌবন লাভ (Interruption & Rejuvenation)
স্বাভাবিক ক্ষয়চক্রের কোনো একটি পর্যায়ে (সমপ্রায়ভূমিতে পরিণত হওয়ার আগেই) যদি কোনো কারণে ভূমিরূপের স্বাভাবিক বিবর্তন ব্যাহত হয়, তবে তাকে ক্ষয়চক্রের বাধা বা ব্যাঘাত (Interruption of Cycle) বলে। এর ফলে নদীতে পুনরায় যৌবন অবস্থার ফিরে আসাকে বলে পুনর্যৌবন লাভ (Rejuvenation)।
পুনর্যৌবন লাভের কারণ: ১. ভূমিভাগের পুনরুত্থান। ২. সমুদ্রবক্ষের অবনমন বা জলতলের পতন। ৩. নদীর জলের পরিমাণ বৃদ্ধি (জলবায়ু পরিবর্তন)।
পুনর্যৌবন লাভের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:
- উপত্যকার মধ্যে উপত্যকা (Valley in Valley): পুরনো চওড়া উপত্যকার মধ্যে নতুন করে গভীর উপত্যকা সৃষ্টি হয়।
- নিক পয়েন্ট (Knick Point): নদী উপত্যকার পুরনো ও নতুন ঢালের সংযোগস্থলে সৃষ্ট খাঁজ, যেখানে জলপ্রপাত সৃষ্টি হতে পারে।
- নদী মঞ্চ (River Terrace): উপত্যকার দুপাশে সিড়ির মতো ধাপে ধাপে মঞ্চ গঠিত হয়।
- কর্তিত নদীবাঁক (Incised Meander): নদীবাঁকগুলি গভীর হয়ে বসে যায়।

ডেভিসের তত্ত্বের মূল্যায়ন
গুণগত দিক (Merits):
১. সরলতা: ডেভিসের তত্ত্বটি অত্যন্ত সরল, প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভাষায় বর্ণিত।
২. ভিত্তি স্থাপন: আধুনিক ভূমিরূপবিদ্যার ভিত্তি বা কাঠামো এই তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
৩. ভবিষ্যদ্বাণী: কোনো অঞ্চলের বর্তমান ভূমিরূপ দেখে তার অতীত ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
ত্রুটি বা সমালোচনা (Demerits):
১. দ্রুত উত্থান: ডেভিস বলেছেন ভূমিরূপের উত্থান খুব দ্রুত হবে, কিন্তু জার্মান বিজ্ঞানী ওয়ালথার পেঙ্ক (Walther Penck)-এর মতে ভূমিরূপের উত্থান একটি ধীর প্রক্রিয়া।
২. উত্থান ও ক্ষয়ের সম্পর্ক: ডেভিসের মতে উত্থান শেষ হলে ক্ষয় শুরু হয়। কিন্তু বাস্তবে উত্থানের সাথে সাথেই ক্ষয়কার্য চলতে থাকে।
৩. সময়ের গুরুত্ব: পেঙ্ক-এর মতে ভূমিরূপ বিকাশে ‘সময়’ (Stage) প্রধান নয়।
৪. স্থিতিশীলতা: দীর্ঘ সময় ধরে একটি ভূমিভাগ স্থিতিশীল থাকবে—’পাত সংস্থান তত্ত্ব’ (Plate Tectonics) অনুযায়ী এটি বাস্তবে সম্ভব নয়।
৫. ক্রিকমে-র মত: বিজ্ঞানী ক্রিকমে সমপ্রায়ভূমির পরিবর্তে ‘প্যানপ্লেন’ (Panplane) ধারণার প্রবর্তন করেন।
উপসংহার: নানাবিধ সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও, ভূমিরূপ বিদ্যার আলোচনায় উইলিয়াম মরিস ডেভিসের ‘স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র’ মডেলটি একটি মাইলফলক। শিক্ষার্থীদের কাছে ভূমিরূপ বিবর্তনের প্রাথমিক ধারণা লাভের জন্য এই তত্ত্বটি আজও অপরিহার্য।
ক্ষয়চক্রের বাধা বা বিঘ্নতা (Interruption of Cycle)
ডেভিসের মতে, যৌবন থেকে বার্ধক্য—এই পথটি সরলরৈখিক। কিন্তু বাস্তবে ক্ষয়চক্র চলাকালীন কোনো প্রাকৃতিক কারণে (যেমন—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার পরিবর্তন বা ভূ-আলোড়ন) যদি ক্ষয়চক্রটি সম্পূর্ণ হতে না পারে বা বাধাপ্রাপ্ত হয়, তবে তাকে ক্ষয়চক্রের বাধা বলে।
বাধার কারণ: ১. ক্ষয়ের শেষ সীমার পরিবর্তন: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমে গেলে (ঋণাত্মক পরিবর্তন) নদীর ক্ষয়ের ক্ষমতা বেড়ে যায় এবং ক্ষয়চক্র দীর্ঘায়িত হয়।
২. জলবায়ু পরিবর্তন: আর্দ্র অঞ্চল শুষ্ক হলে বা তুষার যুগের আবির্ভাবে ক্ষয়চক্র বিঘ্নিত হয়।
৩. প্রাকৃতিক বিপর্যয়: অগ্ন্যুৎপাত বা ভূমিকম্পের ফলে নদীর গতিপথ রুদ্ধ হলে বা ধস নামলে বাধার সৃষ্টি হয়।
পুনর্যৌবন লাভ (Rejuvenation)
ক্ষয়চক্রের বাধার ফলে বা অন্য কোনো কারণে নদীর ক্ষয় করার ক্ষমতা (বিশেষত নিম্নক্ষয়) পুনরায় বৃদ্ধি পেলে, তাকে নদীর পুনর্যৌবন লাভ বলে। নদী বার্ধক্য বা পরিণত অবস্থা থেকে আবার যৌবনের বৈশিষ্ট্যে ফিরে আসে।
পুনর্যৌবনের প্রকারভেদ:
১. গতিশীল পুনর্যৌবন: ভূ-আলোড়নে ভূমিভাগের উত্থান ঘটলে।
২. ইউস্ট্যাটিক পুনর্যৌবন: বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমে গেলে।
৩. স্থিতিশীল পুনর্যৌবন: নদীর জলের পরিমাণ বাড়লে বা নদীগ্রাসের ফলে।
প্রশ্ন: নদীর পুনর্যৌবন লাভের ফলে সৃষ্ট প্রধান ভূমিরূপগুলি চিত্রসহ বর্ণনা করো। (৫ নম্বর)
ভূমিকা: ক্ষয়চক্র চলাকালীন কোনো কারণে (যেমন—ভূমির উত্থান বা সমুদ্রপৃষ্ঠের অবনমন) নদীর শক্তি বৃদ্ধি পেলে নদী পুনরায় নিম্নক্ষয় শুরু করে। একে নদীর পুনর্যৌবন লাভ (Rejuvenation) বলে। এই পুনর্যৌবনের ফলে নদী উপত্যকায় বেশ কিছু বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়। নিচে প্রধান ভূমিরূপগুলি আলোচনা করা হলো:
১. উপত্যকার মধ্যে উপত্যকা (Valley-in-Valley): পুনর্যৌবন লাভের ফলে নদী তার পুরনো প্রশস্ত বা চওড়া উপত্যকার (মৃদু ঢালযুক্ত) মধ্যে নতুন করে নিম্নক্ষয় চালিয়ে গভীর ও সংকীর্ণ ‘V’ আকৃতির (খাড়া ঢালযুক্ত) নতুন উপত্যকা তৈরি করে। প্রস্থচ্ছেদ করলে দেখা যায়, একটি বড় উপত্যকার মধ্যে একটি ছোট উপত্যকা অবস্থান করছে। একে ‘উপত্যকার মধ্যে উপত্যকা’ বা ‘দ্বি-চক্রী উপত্যকা’ (Two-cycle valley) বলে।

২. নিক পয়েন্ট বা নিক বিন্দু (Knick Point): পুনর্যৌবনের ফলে নদীর দৈর্ঘ্য বরাবর পুরনো মৃদু ঢাল এবং নতুন খাড়া ঢাল যে বিন্দুতে মিলিত হয়, সেই সংযোগকারী খাঁজ বা বিন্দুকে ‘নিক পয়েন্ট’ বলে। এই বিন্দুতে নদীর ঢালের হঠাৎ পরিবর্তন ঘটে বলে এখানে প্রায়শই জলপ্রপাত (Waterfalls) বা খরস্রোতের সৃষ্টি হয়। উদাহরণ: সুবর্ণরেখা নদীর জোনা বা গৌতমধারা জলপ্রপাত এবং হুড্রু জলপ্রপাত নিক পয়েন্টে গড়ে ওঠা জলপ্রপাতের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

৩. নদী মঞ্চ (River Terrace): নদীর পুনর্যৌবন ঘটলে নদী উপত্যকাটি কেটে গভীরভাবে নিচে বসে যায়। এর ফলে নদীর পুরনো প্লাবনভূমি বর্তমান নদীখাত থেকে অনেকটা উঁচুতে অবস্থান করে। নদীর দুপাশে এই পুরনো প্লাবনভূমি তখন সিঁড়ির ধাপের মতো মঞ্চের আকারে অবস্থান করে। একে নদী মঞ্চ বলে।

- নদীর দুদিকের মঞ্চগুলি একই উচ্চতায় অবস্থান করলে তাকে জোড় মঞ্চ (Paired Terrace) বলে।
- উচ্চতা অসমান হলে তাকে বিজোড় মঞ্চ (Unpaired Terrace) বলে।
৪. কর্তিত নদীবাঁক (Incised Meander): সাধারণত পরিণত পর্যায়ে নদীতে বাঁক বা মিয়েন্ডার দেখা যায়। এই অবস্থায় পুনর্যৌবন ঘটলে নদী তার ওই আঁকাবাঁকা প্রবাহপথ বজায় রেখেই প্রবল বেগে নিম্নক্ষয় করতে থাকে। ফলে নদীবাঁকগুলো গভীর খাতের মধ্যে অবস্থান করে। একে কর্তিত নদীবাঁক বা খোদিত নদীবাঁক বলে। এটি মূলত দুই প্রকার হয়—
- সমপার্শ্বীয় বা এনট্রেঞ্চড মিয়েন্ডার (Entrenched Meander): যখন নদীখাতের দুপাশের ক্ষয় সমান হয় এবং গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের মতো খাড়া পাড় সৃষ্টি হয়।
- অসমপার্শ্বীয় বা ইনগ্রোল্ড মিয়েন্ডার (Ingrown Meander): যখন নিম্নক্ষয়ের সাথে সাথে সামান্য পার্শ্বক্ষয়ও চলে।
উপসংহার: উপরোক্ত ভূমিরূপগুলি ছাড়াও পুনর্যৌবনের ফলে নদীখাতে অনেক সময় কঠিন শিলা উন্মুক্ত হয়ে ‘স্ট্রাকচারাল বেঞ্চ’ বা গঠনগত ধাপের সৃষ্টি করে। এই ভূমিরূপগুলি নদীর বিবর্তনের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
প্রশ্ন: সমপ্রায়ভূমি বা পেনিপ্লেন কাকে বলে?
উত্তর: আমেরিকান ভূবিজ্ঞানী ডব্লিউ. এম. ডেভিস (W.M. Davis)-এর স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র মতবাদ অনুসারে, ক্ষয়চক্রের বার্ধক্য বা অন্তিম পর্যায়ে দীর্ঘকাল ধরে নদী ও আবহবিকারের মিলিত ক্ষয়ের ফলে যে মৃদু ঢালযুক্ত ও তরঙ্গায়িত প্রায়-সমতল ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, তাকে সমপ্রায়ভূমি বা পেনিপ্লেন (Peneplain) বলে।
শব্দার্থ ও বৈশিষ্ট্য:
- ল্যাটিন শব্দ ‘Pene’ (অর্থ- প্রায়) এবং ইংরেজি ‘Plain’ (অর্থ- সমভূমি) যুক্ত হয়ে পেনিপ্লেন শব্দের উৎপত্তি।
- এই ভূমিরূপের ওপর কঠিন শিলা গঠিত যে অনুচ্চ টিলাগুলি অবস্থান করে, তাদের মোনাডনক (Monadnock) বলে।
প্রশ্ন: মোনাডনক (Monadnock) কী?
উত্তর: উইলিয়াম মরিস ডেভিসের স্বাভাবিক ক্ষয়চক্রের বার্ধক্য বা অন্তিম পর্যায়ে গঠিত সমপ্রায়ভূমির (Peneplain) ওপর কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত যেসকল ক্ষয় প্রতিরোধী অনুচ্চ টিলা বা পাহাড় বিচ্ছিন্নভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের মোনাডনক (Monadnock) বলে।
বৈশিষ্ট্য ও নামকরণ:
- নামকরণ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার প্রদেশের ‘মাউন্ট মোনাডনক’ (Mount Monadnock)-এর নামানুসারে ডেভিস এই নামকরণ করেন।
- আকৃতি: এগুলি সাধারণত কঠিন শিলা দ্বারা গঠিত এবং দেখতে গোলাকার বা গম্বুজাকৃতির হয়।
- উদাহরণ: ভারতের ঝাড়খন্ডের পরেশনাথ পাহাড় একটি উল্লেখযোগ্য মোনাডনক।
প্রশ্ন: স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র (Normal Cycle of Erosion) বলতে কী বোঝো? অথবা, নদীর ক্ষয়চক্রকে ‘স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র’ বলা হয় কেন?
উত্তর: আমেরিকান ভূবিজ্ঞানী ডব্লিউ. এম. ডেভিস (W.M. Davis)-এর মতে, আর্দ্র জলবায়ুযুক্ত অঞ্চলে প্রবাহিত জলধারা বা নদীর কার্যের ফলে ভূমিরূপের যে ধারাবাহিক ও চক্রাকার বিবর্তন ঘটে, তাকে স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র বলে।
‘স্বাভাবিক’ নামকরণের কারণ: পৃথিবীর স্থলভাগের শুষ্ক মরুভূমি এবং চিরতুষারাবৃত মেরু অঞ্চল ছাড়া বাকি পৃথিবীর প্রায় সমস্ত অংশেই (সর্বাধিক বিস্তৃত অঞ্চলে) নদী হলো ভূমিরূপ পরিবর্তনের প্রধান ও সক্রিয় শক্তি। এই প্রক্রিয়াটি ভূপৃষ্ঠের সবথেকে বেশি এলাকা জুড়ে দেখা যায় বলেই ডেভিস নদীর ক্ষয়চক্রকে ‘স্বাভাবিক ক্ষয়চক্র’ (Normal Cycle) নামে অভিহিত করেছেন।
প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা, নোটটি তোমাদের কেমন লাগলো তা কমেন্ট করে জানাও। ভূগোল ও অন্যান্য বিষয়ের নোটস পেতে নিয়মিত ভিজিট করো Webbhugol.com।
প্রশ্ন: ডেভিসের ত্রয়ী কী?
উত্তর: ডেভিসের মতে ভূমিরূপ হলো গঠন, প্রক্রিয়া ও পর্যায়ের ফলশ্রুতি। এই তিনটিকে একত্রে ডেভিসের ত্রয়ী বলে।
প্রশ্ন: নিক পয়েন্ট কাকে বলে?
উত্তর: পুনর্যৌবনের ফলে নদীর পুরনো ও নতুন ঢালের সংযোগকারী বিন্দুকে নিক পয়েন্ট বলে।
প্রশ্ন: প্যানপ্লেন কে প্রবর্তন করেন?
উত্তর: প্যানপ্লেন বা সমোন্নতি ভূমির ধারণা প্রবর্তন করেন বিজ্ঞানী ক্রিকমে (Crickmay)।
